গাজন, চড়ক বা সঙ মোটেই হিন্দু উৎসব ছিল না

সুজিৎ চট্টোপাধ্যায় :  বাবা  তারকনাথের চরণে সেবা লাগে, মহাদেব। এক বিচিত্র সুরে মাসব্যাপী সন্ন্যাস নিয়ে বাংলার ভূমিপুত্র ব্রাত্যজনেরা গাজনের প্রথা পালন করেন সারাদিন অভুক্ত থেকে। রাত্রে দোরে দোরে সংগ্রহ করা চাল ও সবজি দিয়ে রাত্রে মাটির মালসায়  গ্রহণ করেন হবিষ্যান্ন!   ক্লিচ্ছ সাধন করে ভূমি শয্যা। পরনে গৈরিক বসন, গামছা চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন নীল পুজো। যা শিবেরই পুজো। ব্রাত্যজনের ধর্মীয় উৎসব। তাই উৎসবের পরিচয় ব্রত হিসেবে।

চৈত্রের শেষদিনে দেহকে কষ্ট দিয়ে বাণ ফোঁড়া। জিভে, শরীরে। বাজে ঢাক। প্রাচীন লোক গাথা বলেন ভক্তজনেরা। শিব বেটা বোয়ো, বউয়ের পাতে ভাত খেয়েছে, পেট করেছে লেও। সংক্রান্তির আগের দিন ব্রতধারী সন্ন্যাসীরা পড়েন হলুদ রঙের নববস্ত্র স্নান করেন হলুদ জলে। গলায় ঝোলান গুলঞ্চ ফুলের মালা। বিকেলে পিঠের চামড়ায় লোহার আঁকশি গেঁথে চড়ক গাছে চরকি দিয়ে সমবেত ভক্তদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেন ফলমূল বাতাসা, ফুল মালা।

বাণফোঁড়া

মূলত দুটি বিষয় । এক, গাজন ও  সং  হিন্দু ধর্মের দেবতা শিবের উৎসব। অবশ্য বেশিরভাগ মানুষ তাই বলে থাকেন। অথচ বাংলার ব্রাত্য মানুষের লৌকিক উৎসব গাজন, চরক বা সঙ মোটেই হিন্দু উৎসব ছিল না। অনেক প্রাবন্ধিকশিবের অলৌকিক শক্তির কথা বোঝাতে গাজনের এক নিষ্ঠুর প্রথা গাজনের ঝাঁপের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, অলৌকিকভাবে গাজনের ঝাঁপে নাকি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে না। এটা সত্যি নয়। অলৌকিক কিছু নেই। বহু ক্ষেত্রে এই ঝাঁপের খেলা দেখাতে গিয়ে বহু সন্ন্যাসীর মৃত্যু হয়েছে। সেপটিক হয়ে অনেককেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। অলৌকিকতার কথা বলে এক বিপদজনক খাঁপের খেলাকে উৎসাহিত করা হয়। যা ঠিক নয়। রইলো গাজন ও সঙ  আদৌ  শিবের উৎসব কিনা সেই প্রসঙ্গ।

নীলপুজো

সঠিক তথ্য জানতে ইতিহাসে চোখ রাখা যাক। চৈত্র মাসের সংক্রান্তি। বাংলা বছরের শেষদিন। বাংলায় পালিত হয় চড়ক উৎসব। আর গাজন চৈত্রমাসব্যাপী উৎসব। যার তিনটি পর্ব। ঘাট সন্ন্যাস, নীলব্রত ও চড়ক। ইতিহাসবিদরা বলেন,গাজন শব্দের অর্থ গ্রামের জন,বা গাঁয়ের জন। গ্রামের ভূমিপুত্রদের উৎসব। যে উৎসবকে আমরা আজ হিন্দু ধর্মের শিবের উৎসব বলে জেনে এসেছি , আসলে যা লৌকিক দেবতা ধর্ম ঠাকুরের উৎসব। গত রবিবার পড়তে হয়, নাহলে পিছিয়ে পড়তে হয় দৈনিক অভিজাত বাংলা পত্রিকায় ভূমিপুত্র বাঙালির লৌকিক দেবতা ধর্ম ঠাকুরের উল্লেখ করে যমরাজের অবতারণা করলেন। অথচ বাংলার ধর্ম ঠাকুরের সঙ্গে হিন্দুর ধর্মরাজ যমের কোনো সম্পর্কই নেই।

ধর্মঠাকুরের থান

বাংলার আদি ধর্ম নাথ সম্প্রদায়ের পুজোর স্থল ছিল একসময় কলকাতার এসপ্ল্যানেড অঞ্চল। ৩০০ বছর আগেও ইংরেজ হাতির পিঠে চেপে সেখানে বাঘ মেরেছেন। সেই স্থান ধর্মতলা নামে আজও পরিচিত। নাথ ধর্মের সেবক চৌরঙ্গীনাথের আশ্রম ছিল সেখানে। তাই সে অঞ্চল আজও লোকে চৌরঙ্গী নামে চেনে। পরবর্তী সময়ে অনার্য দেবতা শিবের সৃষ্টি। সূর্যের প্রখর তেজ কমাতে নারীরূপী পৃথিবীর সম্পর্ককে স্থায়ী করতে সূর্যের প্রখরতা (কামাবেগ) কমানোই প্রাণী জগতের জন্য মঙ্গল। শৈবপন্থীরা সূর্যকে শিব রূপে মেনে থাকেন। পৃথিবীকে পার্বতী। চৈত্র সংক্রান্তির দিনটি নাকি শিব পার্বতীর বিয়ের দিন। তাই এই দেবস্তুতি।

চৌরঙ্গীনাথ

পুরাণ বলে,দক্ষিণ ভারতের অনার্য রাজা বলির পুত্র বানাসুর। তাঁর পত্নী কন্দলা। তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শিব এর নির্দেশে অসমের শোণিতপুরে রাজধানী স্থাপন করেন রাজা বানাসুর। যা গৌহাটি থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূর। শিবভক্ত বান ছিলেন বিষ্ণু বিরোধী। বানকন্যা কৃষ্ণ পৌত্র অনিরুদ্ধের প্রেমে পড়ে সবার অজ্ঞাতে বিবাহ করেন। রাজা বান খবর পেয়ে অনিরুদ্ধ ও তাঁর সেনাদের বন্দী করেন। পৌত্রকে মুক্ত করতে কৃষ্ণ বানকে পরাজিত করেন। শিব বানের পক্ষে থাকলেও বান পরাজিত হন। অর্থাৎ অনার্য দেবতা শিব এবং তাঁর ভক্ত বান পরাজিত হন আর্য অবতার কৃষ্ণের কাছে। তাই অনার্য ধর্মের এই গ্রাম্য উৎসবে উচ্চবর্ণের বাঙালির যোগদান নেই। সারা চৈত্র মাস দিনে উপোস করে ব্রত পালন করেন সমাজের ব্রাত্য শ্রেণীর মানুষ। যেখানে উচ্চবর্ণের যোগদান নেই।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

হিন্দু আর্যবাদী ধর্মের আগ্রাসনে বাঙালির গাজন, চড়ক বাংলার ভূমিপুত্রদের লৌকিক উৎসব থেকে শিবের পুজোয় পরিণত হল। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় বলেছেন , বাঙালির নীল বা চড়ক যা শিবের সঙ্গে সম্পর্ক তা আসলে ধর্মপুজো । বাংলার মানুষ কেউ হিন্দু ছিলেন না। লৌকিক নাথ ধর্ম ও পরে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। বহু পরে বাঙালির এক অংশ হিন্দু হন। তাও কতটা স্বেচ্ছায় তা নিয়েও বিতর্ক আছে। ড: বারিদবরণ ঘোষ তাঁর সংকলিত ‘বুদ্ধ ও বৌদ্ধ’গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, সামাজিক জনতত্বের দৃষ্টিতে ধর্ম ও চড়ক পূজা দুইই আদিম কোম সমাজের ভূতবাদ ও পুনর্জন্মবাদ বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর লিখিত এক প্রবন্ধে বলেছেন, বাংলায় ধর্ম ঠাকুরের পূজাই হয়ত বৌদ্ধধর্মের শেষ অবস্থা। তিনি বলেন, ধর্মঠাকুর শিবও নন, ব্রহ্মাও নন। ধর্মঠাকুরের আকৃতি ছিল একটি উল্টো কচ্ছপের মত। অর্থাৎ একটি স্তূপ। এই ধর্মঠাকুরের স্তূপ পরে বৌদ্ধস্তুপে পরিণত হয়। এই অন্ত্যজ বাঙালির উৎসবে আজও উচ্চবর্ণের বাঙালি অংশ নেয় না।

স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ

জার্মান প্রাচ্যতত্ববিদ গুস্তাভ ওপার্ট শালগ্রাম শিলা ও শিব লিঙ্গের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে বলেছেন, পুরুষ যৌনাঙ্গের প্রতীক এটি। শক্তির ও সৃষ্টির উৎস। বিবেকানন্দ অবশ্য বলেছেন_ শালগ্রাম শিলাকে পুরুষাঙ্গের প্রতীক ভাবাটা এক কাল্পনিক আবিষ্কার। মূলত যূপকাষ্ঠ অর্থাৎ বলির হাঁড়িকাঠ লিঙ্গের প্রতীক। বলিপ্রথা বিশ্ব জুড়েই ছিল । তাই বিবেকানন্দের মতটি ফেলে দেওয়ার মতও নয়। রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠের এক গ্রন্থে স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ বলেছেন_আদিতে বৃক্ষ পুজো থেকে যূপ কাষ্ঠের সৃষ্টি। বৌদ্ধ অক্ষভ্য ব্রাহ্মণ্যধর্মে হয়েছেন শিব। দ্রাবিড় সম্প্রদায়ের প্রচারে বাংলার ধর্মঠাকুর শিবে পরিণত হলেন। শুধু দ্রাবিড় সভ্যতায় নয়, জমির উর্বরতা ও সূর্যের তেজ পূজিত হয়েছে সব দেশের প্রাচীন পুরাণে। সাত হাজার বছর আগে সুমেরীয় অঞ্চলে পৃথিবীর প্রথম লিখিত ভাষা ক্যুনিফর্মের মাটির ফলকে সাপের বন্দনা আছে।

মিশরে মিলেছে এপিস দেবতার মূর্তি

মিশর অর্থাৎ সেদিনের মেসোপটেমিয়ায় উদ্যত ফণার সাপ ছিল মঙ্গলের প্রতীক। এই মিশরেই মিলেছে এপিস দেবতার মূর্তি। সেখানে মিলেছে বলিষ্ঠ কামের প্রতীক বৃষের মূর্তি। মিশরে স্বামী স্ত্রী, ভাইবোন ও অন্য নিষিদ্ধ সম্পর্কেও যৌনতা ছিল স্বাভাবিক। এই এপিস ষাঁড় ও লিঙ্গোপসনার ধারা বহন করেই দ্রাবিড় সভ্যতায় শৈব উপাসকের সৃষ্টি। আর্যরা শঙ্কিত ছিল বৌদ্ধদের নিয়ে। তাই ব্রাহ্মণ্য আর্য সংস্কৃতি বাংলায় প্রতিষ্ঠিত করতে বছরের দুটি দিন শিব চতুর্দশী ও চৈত্র সংক্রান্তির গাজনকে প্রশ্রয় দিয়েছে আর্য ব্রাহ্মণরা।

বুদ্ধ ও শিবের মূর্তি

দীনেশচন্দ্র সেন বলেছেন বুদ্ধ ও শিবের মূর্তি ৮ম ও ৯ম শতাব্দীতে জনগণের সর্বশ্রেষ্ঠ উপাস্য ছিল। এদিকে জায়গা বদলের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় শিব অথবা বুদ্ধের জায়গা কখনও আর্য দেবতা ব্রহ্মা অথবা বিষ্ণু দখল করতে পারে নি। বুদ্ধ ও মহাবীরের প্রভাব থেকেই শিব উপাসক হয় বাঙালি। আর্যবাদী আগ্রাসনে জাতপাত ক্রমশ বাংলার মাটিতে শিকড় গেঁড়ে বসে। হিসেব মত বাংলায় জাতিভেদ বয়স খুব বেশি হলে সাত _আটশ বছর। আর্য ধর্মের মূল শাস্ত্র ঋগবেদের প্রথম যে কটি সূক্ত নিয়ে নর্ডিক আর্যরা এদেশে আসে তখনও বর্ণ বিভাজন ছিল না। সিন্ধু উপত্যকা অধিকারের পর ক্ষমতার বলে বলীয়ান বুদ্ধিমান মানুষের একটি দল বর্ণ বিভাজন সৃষ্টি করে সামাজিক কর্তৃত্ব নিজেদের হস্তগত করে।ঋগবেদের দশম মণ্ডলের পুরুষ সূক্তের দ্বাদশ ঋক বা মন্ত্রে বলা হয়েছে, ব্রহ্মার মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, ঊরু থেকে বৈশ্য ও পা থেকে শুদ্রের উৎপত্তি।

ড: অতুল সুরের বইয়ের প্রচ্ছদ

ড: অতুল সুর বাংলা ও বাঙালির বিবর্তন গ্রন্থের ৯৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, বাংলায় চতুবর্ণের কোনো সমাজ ছিল না। ছিল কৌম(ট্রাইব ) ভিত্তিক সমাজ।বাংলার ১৬ টি জনপদও এই কৌম জাতির নামে পরিচিত ছিল। যেমন_ পৌন্ড্র(পোদ), বঙ্গ, কর্কট,(কৈবর্ত), বাগদি, সদগোপ, মল ইত্যাদি। ঐতিহাসিকদের একটি অংশের অভিমত, প্রাক পাল বংশের আমলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্রাহ্মণরা বাংলায় আসতে শুরু করে। সেই সময় তাঁদের কোনো পদবী ছিল না। ছিল উপাধি। শর্মা ও স্বামিন। তারপর গাঁই প্রথা চালু। অর্থাৎ বাংলায় এসে তাঁরা যে অঞ্চলের যে গ্রামে বসবাস শুরু করেন সেই গ্রাম গাঁই হিসেবে পরিচিত হয়।৫ জন ব্রাহ্মণ পরবর্তী সময়ে ৫৯গাঁই হিসেবে চিহ্নিত হন। ভট্টশালী গ্রামের বসতি স্থাপনকারী রা চিহ্নিত হলেন ভট্ট আচার্য অর্থাৎ ভট্টাচার্য পদবীতে। বর্ধমানের চাতুটি গ্রামের বসতি স্থাপনকারীরা চট্টোপাধ্যায়, মুখটি গ্রামের বসতি স্থাপনকারীরা মুখোপাধ্যায়, বন্ধ্যঘটি গ্রামের ব্রাহ্মণরা বন্দোপাধ্যায়, গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলা ব্রাহ্মণেরা গঙ্গোপাধ্যায় পদবীতে পরিচিত হন।

ড: আর এম দেবনাথ তাঁর সিন্ধু থেকে হিন্দু (রিডার্স ওয়েজ, বাংলাদেশ) গ্রন্থে আদি পাপ জাতিভেদ অধ্যায়ে লিখেছেন, “পরবর্তী কালে অর্থাৎ পাল আমলেও (খ্রিস্টাব্দ ৭৫০_১২০০) সামাজিক চিত্র প্রায় অভিন্ন ছিল। এযুগে কর্ম বা বৃত্তিভিত্তিক আরও কিছু উপাধির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে: প্রতিবেশী ক্ষেত্রকার(ভূমিকর্ষক), কুটুম্ব(প্রধান প্রধান গৃহস্থ), মেদ, অন্ধ্র,চণ্ডাল। এদিকে চর্যাপদে (দশম শতাব্দী) উল্লেখ পাওয়া যায় আরও কয়েকটি জাতির। এরা হচ্ছে ডোম, শবর, কাপালিক ইত্যাদি। তাদের ছিল ভিন্ন ভিন্ন পেশা। এগুলো কোনো জাতির পরিচয় নয়।”

ড : দেবনাথ লিখেছেন, “উল্লেখিত সমতল সমাজে বসবাসকারী বহিরাগত ব্রাহ্মণরা রাজাদের কাছ থেকে দান হিসেবে ভূমিলাভ করে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। পাল রাজারাও ব্রাহ্মণদের অসম্মান করতেন না। এ সুযোগে নবম_দশম শতাব্দীর দিকেই ব্রাহ্মণরা জাতিভেদ প্রথার বীজ রোপণ করতে থাকে। তারা সুযোগ বুঝে চার বর্ণের আদলে সমাজকে বিভক্ত করার উদ্যোগ নেয়। বলা হয় ব্রাহ্মণ বাদে বাংলার সকল মানুষই সংকর এবং শুদ্র। কেবলমাত্র ব্রাহ্মণরাই নির্ভেজাল। এই প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মচারীরা নিজেদেরকে কায়স্থ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। দেখাদেখি কৈবর্ত ইত্যাদি জাতিরাও নিজেদেরকে স্বতন্ত্র ভাবতে শুরু করে। কিন্তু এই দাবিগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে নি।”

প্রশ্ন ওঠে গাজনের যে উৎসব আমরা শিব পুজোর অঙ্গ হিসেবে জেনে এসেছি তা কতটা সঠিক? ভারতের সনাতন ধর্ম হিসেবে পরিচিত বৈদিক ধর্মে নেই শিবের অস্তিত্ব। ঋক বেদেও নেই। অথর্ব বেদেও নেই। বরং আছে শিব নিন্দা। শিব নামের উল্লেখ প্রথম মেলে মহাভারতে। যিনি পশুপত ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। এই ধর্মের পাঁচ বৈশিষ্ট্য। কার্য কারণ, যোগ বিধি ও দু :খান্তের ওপর তত্ত্ব। এই ধর্মে নেই জাতপাত। আবারও প্রশ্ন উঠতে পারে, শৈব ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের যোগ কোথায়? কোনটি প্রাচীন? মহাভারত রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক পর্যন্ত। শান্তি পর্বে পরিষ্কার উল্লেখ আছে বুদ্ধের মৃত্যুর কয়েকশ বছর পর দক্ষিণ ভারতে শৈব পূজার প্রচলন শুরু। সেখানে শৈব উপাসকদের কয়েকটি সম্প্রদায আছে। শৈব সিদ্ধান্ত, আগমান্ত, লিঙ্গায়েত। ভাগবত পুরাণ বলে, শিব তমোগুণের আধার। উন্মাদ, শ্মশানচারী, বাঁদরের মত চোখ , দিগম্বর, জটাধারী চিতাভস্ম দিয়ে স্নান প্রিয়, অমঙ্গলকারী।

পশুপতিনাথ

শিবের পুজো শুধু ভারতে নয়, নেপালেও হয়।সেখানে পশুপতিনাথ হিসেবে পুজিত। অর্থাৎ পশুদেরও তিনি দেবতা। বাংলায় শিবের পুজোর প্রচলনের এক ঐতিহাসিক তথ্য আছে। বৃহত্তর বাংলা একদিন ছিল দুই বাংলা,বিহার,ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, ও ওড়িশা এবং আসামের বেশকিছু অংশ নিয়ে। বাংলার আদি সমাজ ছিল বৌদ্ধ ধর্ম ও লৌকিক নাথ ধর্মের অনুসারী। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছেনঃ বাংলায় ধর্ম ঠাকুরের পূজাই হয়তো বৌদ্ধ ধর্মের শেষকথা। ধর্ম ঠাকুর শিব, বিষ্ণুর, ব্রহ্মা কোনোটাই নন। ধর্ম ঠাকুরের মূর্তি কচ্ছপের খোলার মত একটি স্তূপ। ফলে এই প্রভাবেই বৌদ্ধ ধর্মে স্তূপ প্রাধান্য পায় সংঘ নির্মাণে।

নাথ ধর্মের প্রবক্তা মৎসেন্দ্রনাথ

বাংলায় আর্য প্রাধান্যের শুরুতে হিন্দু ধর্মের প্রবক্তারা শঙ্কিত ছিলেন বৌদ্ধদের নিয়ে। ফলে বৈদিক ছদ্মবেশে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি বাংলায় প্রতিষ্ঠিত করতে বছরের দুটি দিন চড়ক ও শিবরাত্রিকে মান্যতা দেওয়া হয়। নাথ ধর্মের প্রবক্তা ছিলেন মৎসেন্দ্রনাথ। গোরক্ষনাথ, চৌরঙ্গীনাথ। কলকাতার ধর্মতলা ও চৌরঙ্গী অঞ্চল এই নাথ ধর্মের সাধনা স্থল থাকার সুবাদে নামকরণ হয়।

গ্রীক দেবতা দিওনুসস

গ্রীক পুরাণের গ্রন্থেও আমরা শিবের মত এক দেবতার বর্ণনা পাই। নাম দিওনুসস। বৃষ যাঁর বাহন। তিনি নৃত্য গীতের দেবতা। শিবকেও বলা হয় নটরাজ। নৃত্য ও গীতের দেবতা। ড:সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর দি ইন্ডিয়ান থিয়োগনি; ব্রহ্মা, বিষ্ণুর অ্যান্ড শিবা (পেঙ্গুইন বুকস,ইন্ডিয়া ২০০০) গ্রন্থে বলেছেন , আর্য দেবতা বিষ্ণু ও অনার্য দেবতা শিবকে হিন্দু ধর্মে মেলাতে দুটি দেবতাদের মন্ডলী সৃষ্টি করা হয়। বিষ্ণু ও বিষ্ণু সংশ্লিষ্টগোষ্ঠীতে আছেন – সূর্য, সাবিত্রী, মিত্র, ভগ, অশ্বিনীকুমার, ইন্দ্র ও কৃষ্ণ। আর শৈবগোষ্ঠীতে স্থান পেয়েছেন মাতৃদেবীগণ, যমযমী, কার্তিক, গণেশ, রুদ্র শিব, উমা, অদিতি ও লক্ষ্মী। সে অর্থে শিব দেশজ। বিষ্ণু বাংলার বাইরের আর্য দেবতা।

শিব ও মহাবীর

দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছেনঃ বুদ্ধ ও শিবের মূর্তি ৮ম ও ৯ম শতাব্দীতে জনগণের সর্বশ্রেষ্ঠ উপাস্য ছিলেন। বুদ্ধ, মহাবীর ও দ্রাবিড় প্রভাব থেকেই বাঙালি শিব উপাসক হন। কর্ণাটক থেকে আগত বাংলায় সেনবংশের আমলেই বৌদ্ধ ধর্মের বিদায়ের পালা সূচিত হয়। সেনবংশের আরাধ্য দেবতা ছিলেন শিব। দক্ষিণ ভারতে তখন শৈব প্রভাব বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিল। সেনবংশের লক্ষণ সেন এরপর বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন। বৈদিক ধর্মে আর্য দেবতা শিব অর্থাৎ লিঙ্গপুজাকে ইতর রীতি বলা হয়েছে।বেদে আছে নিন্দাসূচক শ্লোক। কিন্তু অনার্যভূমিতে আর্য সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে কিছুটা কৌশল অবলম্বন করতেই হয়। সেই সূত্রেই ব্রহ্মা বিষ্ণুর সঙ্গে শিবকে স্বীকৃতি দিয়ে ত্রিদেব তত্ত্ব প্রচার করা হয়। তারই প্রতীক তিনটি বেলপাতা। লক্ষ্য করার বিষয়, বৌদ্ধ ধর্মেও আছে ত্রিশরণ ধারণা। বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধর্মং শরণং গচ্ছামি , সংঘং শরণং গচ্ছামি।বুদ্ধদেব হিন্দু প্রভাবে যেমন স্থান হারাতে লাগলেন বঙ্গে,তেমন নাথ ধর্মে হিন্দু সংস্কৃতি মিশে শিব পরিচিত হলেন ভোলানাথ, তারকনাথ, বৈদ্যনাথ, কেদারনাথ,অমরনাথ নামে।

শিব প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ কি বলেছেন দেখা যাক। তিনি তাঁর কালান্তর (বিশ্বভারতী,১৪০০) রচনায় লেখেন, বৌদ্ধ ধর্ম (মধ্য যুগে) তখন জীর্ণ। স্বপ্নে যেমন এক থেকে আর হয়, তেমনি করেই বুদ্ধ তখন শিব হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। শিব ত্যাগী, শিব ভিক্ষু, শিব বেদ বিরুদ্ধ, শিব সর্বসাধারণের। বৈদিক দক্ষের সঙ্গে এই শিবের বিরোধের কথা কবিকঙ্কন এবং অন্নদা মঙ্গলের গোড়াতেই প্রকাশিত আছে।

আর্য সংস্কৃতিতে পুরাণের সূত্র মিশিয়ে রামভক্ত অনার্য হনুমানকে বানানো হয়েছে
শিবের অবতার। অর্থাৎ প্রভু বিষ্ণু, পদপ্রান্তে শিব

শিবও দেখি বুদ্ধের মতো নির্বাণ মুক্তির পক্ষে, প্রলয়েই তার আনন্দ। কিন্তু স্বস্তির দেবতা,ত্যাগের দেবতা টিকল না। পৃষ্ঠা (১৪৯-১৫০)। ক্ষিতি মোহন সেন তাঁর হিন্দু সংস্কৃতির স্বরূপ (বিশ্বভারতী,১৩৮৭) গ্রন্থে লিখেছেন, শিবপূজা একসময়ে ব্রাহ্মণের ও বৈদিকাচারে যে বর্জনীয় ছিল, তাহা আমি জাতিভেদ নামক পুস্তকে আলোচনা করিয়াছি। বৈদিকাচারযুক্ত আর্যেরা চারিদিকে অনার্যের প্রভাবের মধ্যে পড়িয়া শিবপূজা গণপতি পূজা দেবীপূজা প্রভৃতি গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়।পৃষ্ঠা_৮-১২। আর্য সংস্কৃতিতে পুরাণের সূত্র মিশিয়ে রামভক্ত হনুমানকে বানানো হয়েছে শিবের অবতার। অর্থাৎ প্রভু বিষ্ণু, পদপ্রান্তে শিব।সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

২০১৪ তে ক্ষমতায় এসে বিজেপি অনার্য বঙ্গভূমিকে আর্যিকরণের যেমন পরিকল্পনা করে ।,রাজ্য সরকারের উচিৎ ছিল বাংলার সেরা লোক উৎসব গাজন ও চৈত্র সংক্রান্তিতে গুরুত্ব দেওয়া। রাজ্যের বুদ্ধিজীবীরাও সেই পরামর্শ দিলেন না। সম্ভবত বাংলায় রাজনৈতিক রাশ এখনও উচ্চবর্ণের হাতে। বুদ্ধিজীবী মহলের গরিষ্ঠ অংশও উচ্চ বর্ণের। ফলে কিছুটা উদাসীনতা কিছুটাঅজ্ঞতা থেকেই বাংলার দুই সেরা উৎসব পৌষ সংক্রান্তি ও চৈত্র সংক্রান্তি ব্রাত্যই থেকে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *