এখনও নরবলি কামাখ্যার মন্দিরে,পাঁচ বছর আগে বৃদ্ধা বলির ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫

সুজিৎ চট্টোপাধ্যায় : ২০১৯ / ১৯ জুন.. পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে কামাখ্যার মন্দিরে অম্বুবাচী মেলায় এসেছিলেন ৬৪ বছরের প্রবীণ শান্তি সাউ।পশ্চিমবঙ্গের হুগলির বাসিন্দা। সঙ্গে মথুরার এক সাধু ও দুই মহিলা। সেখানে তাঁদের আলাপ হয় মধ্য প্রদেশের এক তান্ত্রিক প্রদীপ পাঠকের সঙ্গে। প্রদীপ তাঁদের জানায়, তাঁর এক ভাই ২০০৮ সালে মারা যায়। সে ছিল নাগা সন্ন্যাসী। তাঁর প্রয়াত ভাইয়ের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ পুজো প্রদীপ করবে। সে প্রত্যেককে নগদ ১০ হাজার টাকা দেয় তাঁর পুজোয় যোগ দেওয়ার জন্য। স্থানীয় শ্মশানে পুজোর আয়োজন করে গভীর রাতে। তন্ত্র সাধনার জন্য অর্ঘ্য সাজানো হয় কারণবারি  দিয়ে। সকলেই মদ্যপান করেন।

শান্তিদেবী আপত্তি করলেও সবার পীড়াপীড়িতে তিনিও পান করেন। অভ্যস্ত না থাকায় শান্তিদেবী সহজেই  তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। প্রদীপ তাঁর পরিকল্পনা মত শান্তি দেবীর দেহটিকে তুলে এনে কামাখ্যার দুর্গা মন্দিরের চাতালে এনে রাখে। তাঁর কাপড় পাল্টে সাদা থান পড়ানো হয়। সঙ্গীরা শান্তিদেবীর হাত পা চেপে ধরে। তান্ত্রিক প্রদীপ পাঠক শান্তিদেবীর  মাথাটা দ্রুত কেটে দেয়। কাটা মুন্ডু ব্রহ্মপুত্র নদে বিসর্জন দিলেও দেহটি মন্দির চত্বরেই ফেলে রাখে। পরদিন আসাম পুলিশ মুণ্ডুহীন দেহটি উদ্ধার করে। শুরু হয় পুলিশি তদন্ত।

এরপর কেটে গেছে পাঁচ বছর। তদন্ত ঢিমেতালে চলতে থাকে। পাঁচ বছর পর সূত্র ধরে আসাম পুলিশ মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর থেকে তান্ত্রিক প্রদীপ পাঠককে গ্রেপ্তার করে। পুলিশি জেরার মুখে প্রদীপ স্বীকার করে বলিপ্রদত্ত শান্তিদেবীর আধার কার্ড ও মোবাইল ফোনটি কোচবিহারের কৈলাশ বর্মণকে দিয়েছিল। পুলিশ কৈলাশকে গ্রেপ্তার করে তাঁর বাড়ি থেকে শান্তিদেবীর ফোন ও আধার কার্ড উদ্ধার করে। এই ঘটনায় মোট পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়। প্রদীপ গ্রেপ্তার হয়  গত ২৫ মার্চ  জব্বলপুর থেকে। কৈলাশ গ্রেপ্তার হয় ১ এপ্রিল কোচবিহার থেকে। শিলচরের পুলিশ কমিশনার দিগন্ত বোরা জানিয়েছেন, মোট ১২ জন এই অপরাধে যুক্ত। বাকি ৭ জনের খোঁজ চলছে।

হিন্দু শাস্ত্রমতে কামরূপের দেবী কামাখ্যার বছরে একবার ঋতুচক্র হয় বলে উল্লেখ আছে। প্রতি বছর তিথি মেনে মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে পাঁচদিন। কেননা হিন্দু মতে  মাসিক ঋতুচক্রের পাঁচ দিন মেয়েরা থাকে অপবিত্র। তবে শুধু পাঁচদিন কেন, গুরু শঙ্করাচার্য তো বলেছেন মেয়েরা নরকের দ্বার। স্বয়ং রামকৃষ্ণদেব বলেছেন , নারী তেঁতুলের মত। ভাবলেই জিভে জল আসে। মৃত্যুশয্য্যাতেও বলে গেছেন, মেয়েমানুষ দেখতে পারি না, দেখলে গা কেমন করে।( শ্রী রামকৃষ্ণের অন্ত্যলীলা _ স্বামী প্রভানন্দ, প্রথম খন্ড, দ্বিতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১১)। আলোচ্য বিষয়ে আসা যাক।

অম্বুবাচীর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা, পৃথিবীরূপী মায়ের বার্ষিক একবার ঋতুস্রাব। আসাঢ় মাসে মৃগশিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে পৃথিবীমাতা  ঋতুমতী হন। অম্বুবাচী পালিত হয় কামাখ্যা দেবীর মন্দিরে। অসমীয়া ভাষায় বলা বেহয় আমতি বা আমোতি। পর্বের শুরু মৃগশিরা নক্ষত্রের চতুর্থ পাদে শেষ আসাঢ় মাসে আদ্যা নক্ষত্রের প্রথম পাদে। এই সময় সমস্ত শুভ অনুষ্ঠান মন্দিরে বন্ধ থাকে। শাস্ত্র ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে , মহাজাগতিক ধারায় পৃথিবী যখন সূর্যের মিথুন রাশির আদ্রা নক্ষত্রে অবস্থান করে সেদিন থেকে বর্ষাকাল শুরু।

পৃথিবীর ভূমি যোনি স্বরূপ। সেখানে লিঙ্গরূপী হাল চাষ করেন কৃষকরা। এই তিথি সময়ে কৃষকরা হাল চাষ করেন না। জমি নারীর যোনির প্রতীক। তাই জন্মদাত্রী মায়ের নাম জননী। মায়ের জনন অঙ্গ থেকেই নতুন প্রাণের সৃষ্টি। বিতর্কিত হলেও মানুষের বিশ্বাস এই সময়ে কামাখ্যা মন্দিরের গর্ভগৃহ সংলগ্ন নালায় মেলে রক্তের ধারা। সেই রক্ত স্রোতে কাপড়ের টুকরা ভিজিয়ে সংগ্রহে পবিত্র বস্তু হিসেবে সঙ্গে রাখেন ভক্তরা। সেই সময়ে মেলা বসে মন্দির প্রাঙ্গণে। সেখানেই গিয়েছিলেন হতভাগ্য শান্তি সাউ।

শান্তি সাউ হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা,তান্ত্রিক মতে কোনো মানব প্রজাতির নারী শুধু নয়, কোনো স্ত্রী পশু পাখি বা সরীসৃপ বলিরও শাস্ত্রীয় বিধান নেই। সেক্ষেত্রে ধৃত তান্ত্রিক এক বৃদ্ধাকে কেন বলির উপকরণ করল বোঝা যাচ্ছে না। বিষয়টির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা খুঁজতে বলি সম্পর্কে তন্ত্রশাস্ত্রের দিকে নজর দেওয়া যাক। হিন্দু তন্ত্র শাস্ত্রে বলা হয়েছে, দেহস্থ আত্মা উষ্ণ শোণিতে অর্থাৎ রক্তে সঞ্জীবিত থাকে। শোনিত শীতল হলে আত্মকেও দেহত্যাগ করতে হয়।সুতরাং আত্মাকে আহুতি দিতে উষ্ণ রক্তই আদর্শ ও শাস্ত্রসম্মত। মুসলিম ধর্মেও রয়েছে বকরী ঈদ। এদেশে আইন অনুসারে অর্থাৎ( দি প্রিভেনশন অফ ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট ১৯৬০) প্রকাশ্যে বলি নিষিদ্ধ। এছাড়াও রয়েছে ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন অ্যাক্ট ও পাবলিক নুইসেন্স অ্যাক্ট। কিন্তু ভোট বড় বালাই। তাই এদেশে শাসক, বিরোধী কোনো দলই এই সব ধর্মীয় কুসংস্কারের দিকে তাকায় না।

কিন্তু শুধু পশুপাখি বলি নয়, আজও একবিংশ শতাব্দীতে নরবলি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সরকারি ভাবে তার সামান্যই উঠে আসে জনসমক্ষে। বাংলা , আসাম, ত্রিপুরা, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা সহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে নরবলি আজও চলছে। ঐতিহাসিক তথ্য বলে, বাংলায় প্রথম দুর্গাপুজোর প্রবর্তক রাজা কংসনারায়ণ পুজোয় নরবলি দিতেন। বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুন্ডলা রচনাতেও কাপালিকের তন্ত্রমতে নবকুমারকে বলির প্রচেষ্টার কথা আছে। ত্রিপুরাকে কেন্দ্র করে বলির বিরুদ্ধে সাহিত্য সৃষ্টি করেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাটক বিসর্জনে।

ঐতিহাসিক তথ্য বলে, পৃথিবীর প্রথম মহাকাব্য গিলগামোশের পাতায় খ্রিস্টপূর্ব ৭ হাজার বছর আগে আসিরিও সাম্রাজ্যে নিনেভা নগরীতে ট্রাইগ্রিস নদীর ধারে নারী পুরুষ ক্রীতদাস বলি হত ভালো ফসলের আশায়। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে নারী বলির কথা থাকলেও ভারতে বা বাংলায় নারী যেহেতু অপবিত্র হিসেবে নির্ধারিত ছিল তাই দেবতার পুজোয় নারী বলি ছিল অবৈধ। আমাদের দেশে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের প্রকৃতি খন্ডের ৬৪ অধ্যায়ে বলা হয়েছে একটি ছাগ বলিতে দেবী তুষ্ট হন দশ বছর। মহিষ বলিতে একশ বছর। মেষ ও কুমড়ো বলিতে এক বছর। কিন্তু গন্ডার ও নরবলিতে দেবী তুষ্ট হন হাজার বছর। এই পুরাণের ৬৭ অধ্যায়ে বলা আছে রুই মাছ বলিতে দেবী সন্তুষ্ট হন তিনশ বছর। হুগলির পিন্ডিরা গ্রামে নাকি বাঘ বলিও হতো।

দেবী কামাক্ষা দেবী কালীরই এক রূপ বলা হয়। কালিকা পুরাণে ৫৫ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, বলির জন্য তালিকায় আছে পক্ষী সকল, কচ্ছপ, কুমির, বরাহ, ছাগল, মহিষ , গো -সাপ, সজারু, মকর, শরভ ( পৌরাণিক আট পেয়ে সিংহ), হরিণ, উট ও গাধা। শতপথ ব্রাহ্মণ শাস্ত্রে ধান, যব বলির পাশাপাশি অশ্ববলি, গো বলি, মেষ বলি ও ছাগ বলির উল্লেখ আছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মে বা শাক্ত ধর্মের তন্ত্র শাস্ত্রে কোথাও নারী বলির উল্লেখ নেই তবে কলিযুগে তন্ত্র সাধনাই শ্রেষ্ঠ সাধনা বলা হয়েছে। বর্তমান কালী মূর্তির রূপকার শ্রীমৎ কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ তাঁর বৃহৎ তন্ত্র শাস্ত্র গ্রন্থে বলেছেন, সর্ব শাস্ত্রের মধ্যে তন্ত্র শাস্ত্র প্রধান।

সুতরাং হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রের বিধান যতদিন হিন্দু সমাজে থাকবে ততদিন বলি প্রথা থাকবে। যাঁরা বেশি উৎসাহী তাঁরাতো শাস্ত্রের নিধনে নরবলিতে ও গন্ডার বলিতে হাজার বছরের পুণ্যঅর্জন থেকে বঞ্চিত হবেন কেন? তবে মারি তো গন্ডার লুটি তো ভান্ডার সে প্রবাদ রাজনৈতিক নেতারা বর্ণে বর্ণে মেনে চললেও অতি ভক্তরা গন্ডার সহজলভ্য নয় বলে বরং নরবলি দিতে পিছুপা হন না। দেশ,সমাজ এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। কথাটা শুনতে ভালো লাগলেও নরবলির মত ঘটনাও ঘটবে। বিষয়টা অনেকটা সেই মিনি বাসের কন্ডাক্টরের কথা মত_ আস্তে আস্তে পিছনের দিকে এগিয়ে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *