ভারতের যুক্তিবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ প্রবীর ঘোষ প্রয়াত

সুজিৎ চট্টোপাধ্যায় : আজ বেলা সাড়ে দশটায় দমদম নাগেরবাজার মতিঝিল অঞ্চলে নিজের বাস ভবনে বয়সজনিত কারণে প্রয়াত হলেন দেশের যুক্তিবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ প্রবীর ঘোষ। প্রয়াত সংগ্রামী চেতনার মানুষটির বয়স হয়েছিল ৭৮। তিনি একমাত্র পুত্র, পুত্রবধূ ও পৌত্রকে রেখে গেলেন। কয়েকবছর আগে তাঁর স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বিপত্নীক প্রবীর ঘোষ বয়সের ভারে শ্লথ হলেও তাঁর যুক্তিবাদী সংগঠন ভারতীয় যুক্তিবাদী সমিতির মশাল তুলে দিয়েছিলেন সুযোগ্য সহযোদ্ধাদের হাতে। প্রবীর ঘোষের দেহ আগামীকাল শনিবার বিজ্ঞানের স্বার্থে দান করা হবে।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত হয় সংগঠনের ৩৮ তম সম্মেলন। শারীরিক কারণে সেখানে উপস্থিত না থাকতে পারলেও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মানসিক ভাবে উপস্থিত ছিলেন। ভারতের মত দেশে যেখানে রাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন মদতে কুসংস্কার মহীরুহ হয়ে ওঠে সেখানে স্রোতের উল্টোদিকে পথ চলা সহজ ছিল না। আজও নেই। তবু জীবিকার জন্য ব্যাংকে চাকরি করলেও প্রতিটি মুহুর্ত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি। জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ মার্চ। পরবর্তী সময়ে তাঁর হাতে গড়া সংগঠণের সদস্যরা তাঁর জন্মদিনটি যুক্তিবাদী দিবস হিসাবে পালন করে চলেছেন। ছোটবেলা তাঁর কেটেছে খড়গপুরে। কোলকাতার দমদমে মতিঝিল কলেজ থেকে স্নাতক হন। জীবিকায় যোগ দেন এস বি আই ব্যাঙ্কে।

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় তাঁর লেখা অলৌকিক নয় লৌকিক বইয়ের কয়েকটি খন্ডের সূত্রে। মুখোমুখি পরিচয় প্রবীর ঘোষের কর্মস্থল এস বি আই ব্যাংকে। সাংবাদিকতার সূত্রে নিয়েছিলাম প্রথম সাক্ষাৎকার। ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রতি আস্থা না থাকার কারণে সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে ওঠে সময়ের সাথে। কলকাতা দূরদর্শন ও তখনকার অগ্রণী টিভি চ্যানেল এ টি এনের পর্দায় প্রবীরবাবুর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জের ঘটনাগুলি ক্যামেরাবন্দি করার সুযোগ ঘটে। সেসব ঘটনা প্রবীর ঘোষ তাঁর বইগুলিতে বিস্তারিতভাবে উত্থাপন করেন। সঙ্গী হিসেবে এবং সেই সব ভান্ডা ফোঁড় করার ঘটনাগুলির সাক্ষী হিসেবে বইগুলিতে আমাকে স্থান দেন।

প্রবীর ঘোষের অলৌকিক নয়, লৌকিক অবলম্বনে চ্যালেঞ্জ সিরিয়ালের কয়েকটি দৃশ্য। দূরদর্শনের জন্য নির্মীয়মান সিরিয়ালটি অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে সম্প্রচারের প্রাথমিক অনুমতি পেলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।

একটা সময় কলকাতা দূরদর্শন কেন্দ্রের চ্যানেলে প্রবীরদা’র লিখিত কুসংস্কার বিরোধী কর্মযজ্ঞ এবং লোক ঠকানো মানুষগুলির মুখোশ খোলার ঘটনা নিয়ে কলকাতার টলিউডের সেরা শিল্পী সমন্বয়ে একটি সিরিয়াল শুরুর আমন্ত্রণ পাই। অভিনয়ে ছিলেন অরুণ বন্দোপাধ্যায়, কুশল চক্রবর্তী দোলন রায়, তাপসী রায় চৌধুরী পি এল টির সত্য বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ। কিন্তু অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে সেই সিরিয়াল ৫ টি পর্ব তৈরি হলেও সম্প্রচারের মুখ দেখলো না। ইচ্ছে ছিল ১০ টি পর্ব তৈরি করার। সেসময় প্রবীরদা এবং যুক্তিবাদী আন্দোলনের আর এক নেত্রী সুমিত্রা পদ্মনাভন আসতেন শুটিং দেখার ফাঁকে পরামর্শ দিতে টালিগঞ্জের স্টুডিওতে।

এরপর কর্মসূত্রে কাজের চাপে যোগাযোগটা ফোনে হতে থাকে। সংগঠন একসময় ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। প্রবীরদার বিরোধিতা করে পাল্টা সংগঠন গড়ে ওঠে। কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির সুযোগ নিতে থাকে স্বার্থানেস্বী কুসংস্কারকে পেশা করা কিছু মানুষ। কিছুদিন আগে ফেসবুক সূত্রে এবং সংগঠনের একজন পদাধিকারী ভ্রাতৃসম সাংবাদিক সন্তোষ শর্মা মারফৎ খবর পেয়েছিলাম বয়সের কারণে প্রবীরদা খুবই অসুস্থ। ইচ্ছে ছিল একবার দেখা করব। কিন্তু অনিবার্য কারণে যাবো যাবো করেও যাওয়া হলো না। এই আক্ষেপটা থেকে যাবে। এই মুহুর্তে প্রবীরদা র মত কিছু মানুষের প্রয়োজন যুক্তিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে। দেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক আগুন আর কু সংস্কার যেভাবে জাঁকিয়ে বসছে সেই বুনো ওলের জন্য প্রবীরদা র মত বাঘা তেঁতুলের খুব প্রয়োজন।

মানুষ মরণশীল। নিয়মের কারণেই প্রবীরদা চলে গেছেন। কিন্তু রেখে গেলেন তাঁর অসীম সাহসী লড়াইয়ের কীর্তি। সামাজিক দায়বদ্ধতার নিরিখে বিজ্ঞানের হাত ধরে প্রবীরদা’র যুক্তিবাদী আন্দোলনকে প্রসারিত করার গুরুদায়িত্ব আশা করি সংগঠনের কর্মীরা নিশ্চিত ভাবে পালন করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *